117
Sharesস্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে সিলেট ও সুনামগঞ্জের রাস্তাঘাট।ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করায় বন্যায় বিধ্বস্ত রাস্তার ক্ষত ভেসে উঠছে।দৃশ্যমান হচ্ছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিহৃ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির বিররণ মিলছে না। তবে, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জেই সড়ক বিভাগ ও এলজিইডির ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়।
এছাড়া সিলেটের আরো ২ হাজার ১৬০ কিলোমিটার সড়ক ধ্বংস হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় বন্যায় দুই জেলায় সড়ক ও ব্রিজ-কালভাটেই তিন হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সড়ক বিভাগ জানিয়েছে, সিলেট-সুনামগঞ্জে সড়ক বিভাগের ৩৬০ কিলোমিটার সড়ক ভেঙে গেছে।
পাশাপাশি এলজিইডির ৪ হাজার কিলোমিটার সড়ক ভেঙে গেছে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে এসব সড়কের কঙ্কাল চেহারা বেড়িয়ে আসছে। ওই সড়কগুলো দিয়ে এখন চলাচল করাই দায় হয়ে পড়েছে। দ্রুতই এগুলো পুনর্গঠন করতে হবে।
সিলেটের সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, বন্যায় সিলেটে সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রায় ১২৫ কিলোমিটার সড়ক তলিয়ে গেছে।পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে সড়কের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।
পানি উঠে অনেক সড়কে ভাঙন দেখা দিয়েছে। কার্পেটিং উঠে গেছে প্লাবিত প্রায় সব সড়কের। সড়ক ও সেতুর এপ্রোচ সড়কেও দেখা দিয়েছে ধস। পাশাপাশি অনেকগুলো ব্রিজ ও কালভার্ট ভেঙে গেছে।
সিলেট-ভোলাগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়কের ১৯তম কিলোমিটারে ব্রিজের দুই পাশ বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সড়কটি মেরামত করে শুক্রবার থেকে যান চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে।
সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক এখনও বেশিরভাগ অংশে পানি রয়েছে। বন্যায় কাষতিগ্রস্থ সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট সংস্কার করতে হবে। এতে ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে সড়ক মেরামতের জন্য ৫০ কোটি এবং স্থায়ীভাবে মেরামতের জন্য দুইশ কোটি টাকার চাহিদা দেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জের সড়ক জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম প্রামাণিক বলেন, বন্যার কারণে ২০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এতে ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ভাঙা সড়কগুলো সংস্কার করে সাময়িক যানবাহন চলাচলের কাজ করছেন তারা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম বলেন, বন্যায় পানির স্রোতে জেলার বেশ কয়টি সড়কের মারাত্মকভাবে ভেঙে গেছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো পরিদর্শন করে আসছি।
বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত জেলায় ৭৮৫টি সড়কের ২ হাজার কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১২০টি ব্রিজ-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়ক মেরামতে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন মনে করছি।
এখনো জেলার অনেক গ্রামীণ সড়কে বন্যার পানি আছে। তাই ক্ষয়ক্ষতি চূড়ান্ত করা হয়নি। সেগুলো জেগে উঠলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। এদিকে বন্যায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর'র (এলজিইডি) আওতাভূক্ত সড়কগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে নির্বাহী প্রকৌশলী এনামুল কবীর।
তিনি বলেন, জেলায় এলজিইডি’র আওতাধীন ৭ হাজার ৫১০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে জেলার ১৩ উপজেলার অধিকাংশ সড়কই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।পানি নামতে শুরু করায় ক্ষতিগ্রস্থ সড়কগুলোর চিত্র ফুটে উঠছে।অনেক সড়ক এখনো পানিতে তলিয়ে আছে।
যে কারণে ক্ষয়ক্ষতির পুরো বিবরণ পেতে সময় লাগছে।তাঁর মতে, এবারের ভয়বাহ বন্যায় গ্রামীণ সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট ডুবে গিয়ে হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, প্রথম দফা বন্যায় জেলার ১২০টি সড়কের প্রায় ২৭৮ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েয়। এতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৪৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
এবারের বন্যায় শুধু সড়কেই ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সিলেট অঞ্চলের প্রায় ২২ লাখ মানুষ।প্রশাসনের হিসেবে সিলেটের ২২ হাজার ৪৫০টি আর সুনামগঞ্জের অন্তত ১০ হাজার বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে গেছে পানির তোড়ে। এসব পরিবার এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে আছে।
তাই বন্যা শেষ হলেও সর্বস্ব হারানো এসব মানুষ কবে নিজ ভিটায় উঠতে পারবেন, তা একেবারেই অনিশ্চিত। সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি লতিফুর রহমান রাজু জানান, স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছিল সুনামগঞ্জ।
উজানে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কারণে এবার ভাটির জেলা সুনামগঞ্জে বন্যার ভয়াবহতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ১৬ জুন রাত থেকে মাত্র ১২ ঘণ্টায় পুরো সুনামগঞ্জ জেলা বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়।
এতে সুনামগঞ্জের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দ্রুতগতিতে বন্যা ভয়াবহ রূপ নেওয়াতে সুনামগঞ্জের দু'টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পুরো জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
সুনামগঞ্জ পৌরশহর থেকে শুরু করে সীমান্তবর্তী ও দুর্গম গ্রামের অনেকের কাঁচা এবং অর্ধ-কাঁচা ও ইটের তৈরি বাড়িঘরও পানির তোড়ে ভেঙে যায়। গবাদিপশু, হাঁস মুরগিও ভেসে গেছে বানের জলে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার সড়কগুলো। অবস্থা এমন যে, যেন সুনামির ছোবলে সুনামগঞ্জকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে! পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠেছে সড়ক, মহাসড়ক, অনেক সেতু ও কালভার্ড- গ্রামীণ সড়কের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের সুনামগঞ্জে প্রায় ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলেও জানিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ও সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
সরজমিনে ঘুরে দেখা যায় সিলেট-সুনামগঞ্জের মহাসড়ক, উপজেলা সড়ক ও গ্রামীণ সড়কে পানির তোড়ে ড্রেনের মতো গহীন হয়েছে। জেলার প্রধান প্রধান সড়কের বেশ কয়েকটি স্থানে বড় বড় আকারে ভেঙে যান চলাচলের অনুপযোগী হয়েছে।
এসব সড়ক যেখানে সম্ভব ইট-পাথর দিয়ে যান চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সড়ক ও জনপথ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। তবে সুনামগঞ্জের নিচু এলাকার অনেক সড়ক এখনও পানির নিচে রয়েছে।
জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে বানের স্রোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দোয়ারাবাজার ও ছাতক, সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর, মদনপুর-দিরাই-শাল্লা এলাকায়। এ ছাড়া সুনামগঞ্জের পৌর শহরের বিভিন্ন সড়কের ও জেলার কয়েকটি উপজেলার সড়কগুলোর পিচ-খোয়া উঠে বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় অসংখ্য খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে।
সৃষ্টি হওয়া ছোট-বড় গর্ত এড়িয়ে যানবাহন চলছে এঁকেবেঁকে। এতে যান চলাচল করতে হয় ধীরগতিতে। গর্তে পড়ে ঘটছে দুর্ঘটনাও। বন্যার ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর-বিশ্বম্ভপুর উপজেলার সড়ক দেখলে মনে হবে শক্তিশালী এক সুনামির ছোবল পড়েছে এসব এলাকায়।
গাছ-ঘরবাড়ি যেমন দুমড়েমুচড়ে গেছে, তেমনিভাবে দুমড়েমুচড়ে গেছে বিশ্বম্ভপুর উপজেলার সড়ক। কোথাও কোথাও সড়কের কার্পেটিং ও বেইজিং সরে গিয়ে স্রোতে দুই থেকে দুই থেকে তিন ফুট মাটি সরে গেছে।
বিশ্বম্ভপুর উপজেলার চালবন পয়েন্ট স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মাদ আলাউদ্দিন বলেন, ঘরবাড়ি পানির নিচে, চারপাশে অথৈই পানিতে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ারও উপায় ছিল না। এই সড়ক দিয়ে যে উঁচু কোনো জায়গায় যাবো সেই ব্যবস্থাও ছিল।
এই বন্যায় আমাদের প্রধান সড়কটা একেবারে ভেঙে ঠুকরা ঠুকরা করে দিছে। এখন এই ভাঙ্গা সড়কে যাতায়াত করার মত উপযোগী রয়েছে না। তাহিরপুর উপজেলার বাসিন্দা সেলিম আহমেদ বলেন, এমন প্রবল স্রোত আমার বয়সে দেখি নাই।
একটা পাকা সড়কের অংশকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। তাহলে বুঝতেন যে, কত শক্তিশালী ছিল এই পানির চাপ! আর আমরা খুবই ক্ষতিগ্রস্ত ছিলাম এই রাস্তায় মানুষ চলাচল করতে পারে নাই। এই এলাকার মানুষের কষ্ট দুর্দশা আমার জীবনে আর দেখেনি।
সরকারের কাছে দাবি দ্রুত যেনো আমাদের সড়কটা মেরামত করে দেয়। ছাতক উপজেলার সিএনজি চালক শামীল মিয়া বলেন, বন্যায় আমাদের সড়ক ভেঙ্গে গেছে। এখন এই সড়কে গাড়ি নিয়ে চলাচল করতে খুবই অসুবিধা হয়।
গাড়ি দিয়ে চলাচল করতে ভয় হয়, ভাঙ্গায় পরে গাড়ি উল্টে পরে যায়। এর মধ্যে আমার দেখা দু-একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। সকালে আমি আমার গাড়ি নিয়ে উল্টে গেছিলাম, আমি গরিব মানুষ নাইর মাঝে আমার অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেল।
কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাই, বন্যায় ভেঙে যাওয়া সড়কগুলো যেন দ্রুত মেরামত করা হয়। সড়ক ও জনপথ, সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমাদের আট সড়কের ১৮৪ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে এখনও পানি নেমে যায়নি। পুরোপুরি পানি নামলে ক্ষয়ক্ষতির আসল চিত্র পাওয়া যাবে। যেসব ক্ষতিগ্রস্ত জায়গা ভেসে উঠছে ইতোমধ্যে সেগুলোতে ইটের সলিং, বালু ফেলে যানবাহন চলাচলের উপযোগী সড়ক করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম বলেন, বন্যায় পানির স্রোতে জেলার বেশ কয়টি সড়কের মারাত্মকভাবে ভেঙে গেছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো পরিদর্শন করে আসছি।
বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত জেলায় ৭৮৫টি সড়কের ২ হাজার কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১২০টি ব্রিজ-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়ক মেরামতে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন মনে করছি।
এখনো জেলার অনেক গ্রামীণ সড়কে বন্যার পানি আছে। তাই ক্ষয়ক্ষতি চূড়ান্ত করা হয়নি। সেগুলো জেগে উঠলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। সুনামগঞ্জ পৌর মেয়র নাদের বখত বলেন, বন্যায় আমার পৌর এলাকার সমস্ত বিটুমিনের সড়কগুলোর খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাবো তখন সরকার বরাদ্দ দিলে মেরামত কাজ শুরু করতে পারবো। আর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আমি বলতে পারবো না সেটা পৌরসভার ইঞ্জিনিয়ার আছেন তিনি ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিতে পারবেন।