186
Sharesদেশের চা শিল্পের চলমান সংকট ক্রমেই অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে। মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনের অষ্টম দিনে এসেও সমাধানের আলোর দেখা মিলছে না। শ্রমিকরা যতো টাকা মজুরিবৃদ্ধি চান, তা দিতে নারাজ মালিকপক্ষ।
আবার মালিকপক্ষ যা দিতে চান, তাতে খুশি নন শ্রমিকরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্থবির দেশের ১৬৭টি চা বাগান। সমাধানের পথ খুঁজতে আরেক দফা ঢাকায় বৈঠক ডাকা হয়েছে। মঙ্গলবার এই বৈঠক হওয়ার কথা।
চা শ্রমিকরা জানান, বর্তমানে তারা ১২০ টাকা মজুরি পান। এই মজুরি ‘অন্যায্য’ ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে করছেন তারা। মজুরি ৩০০ টাকায় উন্নীত করার দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিকরা।
শ্রমিকরা জানান, সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১২০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন তারা। এই মজুরি ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বৃদ্ধির কথা ছিল। কিন্তু মালিকপক্ষ নানা টালবাহনা করে মজুরি চুক্তি বাস্তবায়ন করেননি।
শ্রমিকরা এখন দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরি চাইছেন। দফায় দফায় দাবি জানানোর পরও তাদের দাবি মালিকপক্ষ মেনে না নেওয়ায় গত শনিবার (১৩ আগস্ট) সকাল ৬টা থেকে সিলেটসহ সারাদেশেই চা-শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেছেন। ফলে বাগানগুলোর কাজকর্ম থমকে গেছে।
চা বোর্ডের তথ্যানুসারে, দেশে ১৬৭টি নিবন্ধিত চা বাগানের মধ্যে ১৩৫টিই সিলেট অঞ্চলে। চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটিতে ২৩টি এবং পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে ৯টি চা বাগান আছে। সিলেট অঞ্চলে চা বাগানের সংখ্যা বেশি হওয়ায় চা শ্রমিকদের আন্দোলনের আঁচও এখানে বেশি।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট>>
চা শ্রমিক ও শ্রমিক নেতারা জানান, চা শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র সংগঠন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন। শ্রম আইন অনুসারে চা শ্রমিকদের পক্ষে দরকষাকষি করে এই সংগঠন।
সম্প্রতি চা-বাগান মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বাংলাদেশ চা সংসদের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনয়ায় শ্রমিক ইউনিয়ন চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, বোনাস প্রদান, ছুটিসহ বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করে।
কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। পরবর্তীতে মালিকপক্ষ মজুরি ১৪ টাকা বাড়নোর প্রস্তাব দেয়। কিন্তু চা শ্রমিকরা এই মজুরি বৃদ্ধিকে ‘পরিহাস’ বলে মনে করছেন। চা শ্রমিক ইউনিয়ন নেতারা জানান, গত ১ আগস্ট চা শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী কমিটি ও ভ্যালি কমিটিসমূহের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভা থেকে চা সংসদে স্মারকলিপি প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। গত ৩ আগস্ট সেই স্মারকলিপি প্রদান করে চা শ্রমিক ইউনিয়ন। সেখানে সাতদিনের মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে ‘গ্রহণযোগ্য সুরাহার’ দাবি জানানো হয়।
অন্যথায় আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। আলটিমেটামের মধ্যে মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় গত ৮ আগস্ট থেকে আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামেন চা শ্রমিকরা।
আন্দোলন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা সিলেটভিউকে বলেন, ‘দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে আমরা গত ৮ আগস্ট থেকে কর্মসূচি পালন করে আসছি।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি দাওয়া নিয়ে ১১ আগস্ট চা বাগানগুলোর মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের নিয়ে সমঝোতা বৈঠক করে বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তর। মালিকপক্ষের কেউ বৈঠকে আসেননি।
এতে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। ফলে ১৩ আগস্ট সকাল ছয়টা থেকে দেশের সবগুলো চা বাগানের শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন।’ শ্রমিকদের এই ধর্মঘটের আজ অষ্টম দিন।
আজও সিলেটসহ দেশের সব চা বাগান এলাকাতেই বিক্ষোভ, মানববন্ধন, সমাবেশ করেছেন চা শ্রমিকরা। চা শ্রমিক নেতা রাজু গোয়ালা বলছেন, ‘আমাদের ৩০০ টাকা মজুরি বাস্তবায়নের দাবি না মানা পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।’
প্রথম বৈঠক ব্যর্থ>>
গত মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শ্রম অধিদফতরের আঞ্চলিক কার্যালয়ে চা শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে শ্রম অধিদফতর কর্তৃপক্ষের দুই দফা বৈঠক হয়। বৈঠকে আগামী ২৩ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করার আহ্বান জানান শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খালেদ মামুন চৌধুরী।
কিন্তু বাগান মালিকপক্ষের কেউ বৈঠকে উপস্থিত না হওয়ায় মহাপরিচালকের কথা রাখেননি চা শ্রমিক নেতৃবৃন্দ। তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। ওইদিন চা শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেন শ্রম অধিদফতরের মহাপরিচালক খালেদ মামুন চৌধুরী। সেদিন সকাল সাড়ে ১১টায় প্রথম বৈঠক শুরু হয়।
বৈঠক চলে টানা তিন ঘন্টা। সেখানে শ্রম অধিদফতরের পরিচালক মো. গিয়াস উদ্দিন, হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো.সাদিকুর রহমান, মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শাহীনা আক্তার, শ্রীমঙ্গলস্থ বিভাগীয় শ্রম অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা পরাগ বারই, সভাপতি মাখল লাল কর্মকার, সহসভাপতি পঙ্কজ কন্দ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল, সাংগঠনিক সম্পাদক ও বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা, অর্থ সম্পাদক পরেশ কালেন্দি, সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা, মনু ও ধলাই ভ্যালির সভাপতি ধনা বাউরী, জুড়ী ভ্যালির সভাপতি কমল চন্দ্র বোনার্জী বক্তব্য দেন।
শ্রম অধিদফতরের মহাপরিচালক ২৩ আগস্ট অবধি কর্মসূচি স্থগিত রাখতে আহ্বান জানান চা শ্রমিক নেতাদের। তারা তাতে সাড়া দেননি। বিবেচনার জন্য শ্রমিক নেতাদের আরো এক ঘন্টা সময় দেওয়া হয়। এরপর দ্বিতীয় দফা বসে বৈঠক। কিন্তু সেখানেও হয়নি কোনো সুরাহা।
ঢাকার বৈঠকেও সমাধানের দেখা নেই>>
চা শ্রমিকদের আন্দোলনকে ঘিরে ঢাকায় সমাধান ছাড়াই শেষ হয় ত্রি-পক্ষীয় বৈঠক। গত বুধবার (১৭ আগস্ট) সন্ধ্যার পর রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাগান মালিকদের সঙ্গে শ্রম অধিদফতরের কর্মকর্তারা এ বৈঠক করেন। রাতে শেষ হওয়া বৈঠকে কোন সমাধান আসেনি।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের মজুরি ১২০ টাকা। দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই ১২০ টাকায় কোনভাবেই সংসার চালানো সম্ভব নয়। আমরা ৩০০ টাকা মজুরির প্রস্তাব করেছি। আমাদের প্রস্তাব না মানা হলে কর্মবিরতি চলতে থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘মালিকপক্ষ বলছে, আমরা আন্দোলন বন্ধ করলে তারা আমাদের সাথে বসে সিদ্ধান্ত নেবেন। মালিকপক্ষ আমাদের বর্তমান মজুরির সঙ্গে আরও ১৪ টাকা যোগ করে মোট ১৩৪ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। আমরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি।’
ফের ঢাকায় বৈঠক মঙ্গলবার>>
এদিকে, আন্দোলনে ঘনীভূত হওয়া সংকট কাটাতে আবারও ঢাকায় বৈঠক ডাকা হয়েছে। আগামী ২৩ আগস্ট এই বৈঠক হওয়ার কথা। শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা বলেন, ‘২৩ আগস্ট আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক রয়েছে।
সেখানে চা বাগান মালিক ও শ্রমিক নেতারা বসবেন। শ্রম অধিদফতরের মহাপরিচালক ও মন্ত্রীও উপস্থিত থাকবেন। সেখানে মজুরির বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনায় সমঝোতা হবে বলে আশা করছি।’
সংকটে শ্রমিক>>
টানা আন্দোলন চলছে। বন্ধ কাজ। তাই মিলছে না মজুরি, খাদ্য। এতে সংকটের মধ্যে পড়েছেন আন্দোলনরত চা শ্রমিকরা। অনেক শ্রমিকের ঘরে খাবার ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু দাবি আদায়ে তারা আন্দোলনে অনড়।
এই পরিস্থিতিতে চা শ্রমিক ইউনিয়ন অনাহারে থাকা শ্রমিকদের ঘরে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে। চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাহী উপদেষ্টা রাম ভজন কৈরী বলেন, কর্মবিরতির পাশাপাশি আলোচনা চলছে। শ্রমিকদের ঘরে খাবার ফুরিয়ে যাচ্ছে।
আধপেটা খেয়ে না-খেয়ে তবু কর্মবিরতি পালন করছেন তাঁরা। কারণ, এ ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা জানান, যাদের একেবারে খাওয়ার ব্যবস্থা
নেই, তাদেরকে বাছাই করে খাদ্য সহায়তা দিতে একটি গোপন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করছে।
মালিকপক্ষ যা বলছে>>
চা বাগান মালিকপক্ষ বলছে, শ্রমিকদের আন্দোলনে চায়ের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বাজারকে ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে। শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে প্রতিদিন এ খাতে ২০ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হচ্ছে।
চা বাগান মালিকপক্ষের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) গত ১৬ আগস্ট একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে তারা দাবি করে, চা শ্রমিকরা দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরি দাবি করলেও একজন শ্রমিক দৈনিক প্রায় ৪০০ টাকা সমপরিমাণ সুবিধা পেয়ে থাকেন।
প্রত্যক্ষ সুবিধার মধ্যে দৈনিক নগদ মজুরি ছাড়াও ওভারটাইম, বার্ষিক ছুটি ভাতা, উৎসব ছুটি ভাতা, অসুস্থজনিত ছুটি ভাতা, ভবিষ্যৎ তহবিল ভাতা, কাজে উপস্থিতি ভাতা, ভবিষ্যৎ তহবিলের ওপর প্রশাসনিক ভাতার মাধ্যমে সর্বমোট গড়ে দৈনিক মজুরির প্রায় দ্বিগুণ নগদ অর্থ দেওয়া হয়।
তাদের দাবি, শ্রমিকদের সামাজিক উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য দৈনিক ১৭৫ টাকার বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বিটিএ’র বিবৃতিতে বলা হয়, খাদ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভর্তুকির মাধ্যমে দুই টাকা কেজি দরে মাস প্রতি শ্রমিককে প্রতি মাসে ৪২ দশমিক ৪৬ কেজি চাল অথবা গম রেশন দেওয়া হয়।
শ্রমিকদের খাদ্য নিরাপত্তা সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে প্রায় ৯৪ হাজার ২শ বিঘা জমি চাষাবাদের জন্য বন্টন করা হয়েছে। শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য নিশ্চিতে ১৬ সপ্তাহের মজুরিসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির পাচ্ছেন নারী শ্রমিকরা।
একজন শ্রমিকের বসত বাড়ির জন্য পরিবার প্রতি ১ হাজার ৫৫১ স্কয়ার ফিট করে বাড়িসহ সর্বমোট ৫ হাজার ৮শ বিঘা জায়গা দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দুটি বড় গ্রুপের ও ৮৪টি বাগানের হাসপাতালে ৭২১ শয্যার ব্যবস্থা, ১৫৫টি ডিসপেনসারসহ সর্বমোট ৮৯১ জন মেডিক্যাল স্টাফ নিয়োজিত আছেন।
শ্রমিকদের সন্তানদের সুশিক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রাথমিক, জুনিয়র ও উচ্চবিদ্যালয় মিলিয়ে সর্বমোট ৭৬৮টি বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে এক হাজার ২৩২ শিক্ষকের মাধ্যমে এখন ৪৪ হাজার ১৭১ জন শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে।
এছাড়াও অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকের ভাতা, বিভিন্ন রকম শ্রমিক কল্যাণ কর্মসূচি যেমন বিশুদ্ধ খাবার পানি, ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, পূজা, বিনোদন প্রভৃতি কর্মকাণ্ডে সামগ্রিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়ে থাকে।
তাছাড়াও, চা শ্রমিকের অবসরের পর তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা চাকরিতে নিয়োগ পেয়ে থাকে, যা একজন চা শ্রমিকের চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকে।