সিলেট প্রতিক্ষণ



নিজস্ব প্রতিবেদক

মে / ১৬ / ২০২১


রায়হানদের বাড়ি

পাষন্ড আকবর আমাদের ঈদ কেড়ে নিয়েছে


300

Shares

এই প্রথম রায়হান আহমদকে ছাড়া ঈদের দিন তাঁর কাটলো মা, স্ত্রী ও সন্তানের। রায়হানকে ঘিরে ছিলো যাদের ঈদের দিনের মূল আনন্দ, সেই রায়হান না থাকার কারণে শুক্রবার ঈদের দিন ছিলো তাদের কাছে বিষাদের। রায়হানদের বাড়িতে ঈদের দিন ছিলো কান্নার রোল।

গত বছরের ১১ অক্টোবর রাতে সিলেট নগরীর বন্দরবাজার ফাঁড়িতে আখালিয়া এলাকার যুবক রায়হান আহমদকে (৩৪) ধরে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করে পুলিশ। এর ফলে সকালে তিনি মারা যান।

সিলেটের চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার অভিযোগপত্র গত ৫ মে কোর্ট পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।এতে ওই ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (বরখাস্ত এসআই) আকবর হোসেন ভূঁঞাসহ ৬ জনের নাম রয়েছে। করোনাকালীন অবস্থা শেষে আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর কোর্ট পুলিশ অভিযোগপত্রটি আদালতে দাখিল করবে।

রায়হান হত্যা মামলাটি বিচারাধীন, এই অবস্থায় তাকে ছাড়া প্রথমবারের মতো ঈদের কাটলো মা সালেহা বেগম, স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি ও ১০ মাস বয়েসি সন্তান আলফার।

সন্তান ছাড়া কেমন কাটলো ঈদ- অনুভূতি জানাতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন সালমা বেগম। দেশদর্পণকে জানালেন, আমাদের তো আর ঈদ নেই। আমাদের ঈদ আর সকল আনন্দ কেড়ে নিয়েছে পাষণ্ড আকবর ও আশেকে এলাহিরা। আমাদের ঘরে সবকিছু আছে, কিন্তু আমার কলিজার টুকরো রায়হান নেই। আর রায়হান নেই বলেই সারা বাড়িতে শোকের মাতম।

তিনি বলেন, গত ঈদেও এ বাড়িতে রায়হানের পদচারণা ছিলো। আজ পুলিশের পোশাকধারী কিছু পাষন্ড আমাদের সকল আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। আমি প্রতি ঈদে মার্কেট থেকে নিজে রায়হানের জন্য নতুন কাপড় ক্রয় করতাম। কিন্তু এবারও আমি মার্কেটে গিয়েছি, কিন্তু বাসায় ফিরেছি কেঁদে কেঁদে। শুধু রায়হানের মেয়ে ও স্ত্রীর জন্য কাপড় কিনে নিয়ে চলে এসেছি। ঈদের পুরো দিনই আমাদের বাড়িতে ছিলো কান্না আর মাতম।

রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি কথা বলতে গিয়েই বকারুদ্ধ হয়ে যান। কান্নার ঢেউ তুলে বলেন, জীবনের বেঁচে থাকার অলম্বন স্বামী ছাড়া একজন স্ত্রীর ঈদ কেমন কাটে সেটি কেবল স্বামীহারা স্ত্রী হৃদয় দিয়ে বুঝতে পারে, বলে বুঝাতে পারে না।

বিবাহিত জীবনে রায়হানের সঙ্গে ৩টি ঈদ কাটিয়েছেন উল্লেখ করে তান্নি বলেন, সারাটা জীবন পড়ে রয়েছে। মাত্র ৩টি ঈদে স্বামীকে কাছে পেয়েছি। আর কোনো ঈদে স্বামীকে দেখতে পাবো না- ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসে।

সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) কোতোয়ালি থানাধীন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে গত বছরের ১১ অক্টোবর রাতে নির্মম নির্যাতনের ফলে মারা যান নগরীর আখালিয়া এলাকার যুবক রায়হান আহমদ (৩৪)। দেশ-বিদেশ তোলপাড় করা এ হত্যাকাণ্ডের মামলায় দেওয়া অভিযোগপত্রে ‘অসন্তুষ্ট’ রায়হানের মা।

সালমা বেগম জানান, চার্জশিটের নকলের জন্য আদালতে আবেদন করেছেন। সেটি হাতে পেলে চার্জশিটের উপর নারাজি দিবেন কি-না এ বিষয়ে তাদের আইনজীবির সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

চার্জশিট দাখিলে দিন সালমা বেগম দেশদর্পণকে বলেছিলেন , অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত আরও কয়েকজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রে রায়হানের নামে আরও কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো বানোয়াট এবং সাজানো। তবে অভিযোগপত্র আদালত থেকে উঠিয়ে পর্যালোচনার পর আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সময়ে পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান তিনি।

সালমা বেগম বলেন, ‘আমরা অভিযোগপত্রের জন্য প্রায় আট মাস অপেক্ষা করেছি। আশা করেছিলাম নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে একটি ভালো ফলাফল পাব। কিন্তু যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে সেটি আসামিদের পক্ষে চলে গেছে। রায়হানকে মাদকাসক্ত, মাদক ব্যবসায়ী কিংবা ছিনতাইকারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের কাছে বানোয়াট ও সাজানো বলে মনে হয়েছে। যদি ছিনতাই কিংবা মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকত, তাহলে সেদিন আমাদের সঙ্গে রায়হানকে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি কেন? সে সময় যদি আমাদের দেখা করার সুযোগ দেওয়া হতো তখন আমরা জিজ্ঞেস করতে পারতাম। এখন রায়হান মারা যাওয়ার পর বিভিন্ন বিষয়ে বলা হচ্ছে। যেগুলো রায়হান জীবিত না থাকায় আমারা হয়তো প্রমাণ করতে পারবো না। রায়হানের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আমাদের খবর দেওয়া হয়েছে। তবে প্রথম দিকে আমাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। যাতে আমরা ঘটনার কিছুই জানতে পারিনি।’

অভিযোগপত্রে পাঁচ পুলিশ সদস্যসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করা প্রসঙ্গে সালমা বেগম বলেন, অভিযুক্তদের মধ্যে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্য (কনস্টেবল) তৌহিদ মিয়ার মুঠোফোন থেকে ফোন দিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রায়হান। কিন্তু অভিযোগপত্রে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়নি। সে সঙ্গে কুতুব আলী নামের এক পুলিশ সদস্যকেও অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত করা হয়নি। ঘটনায় অভিযোগকারী হিসেবে সাইদুল শেখ ও রনি শেখকেও অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত করা হয়নি।

পিবিআইয়ের প্রেস ব্রিফিংয়ে রায়হানের বিরুদ্ধে দুটি মামলার কথা উল্লেখ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের দুটি ভাড়া বাসা ছিল। সেখানে ভাড়া আনতে গিয়ে রায়হানকে সন্দেহজনক হিসেবে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। সে সময় ভাড়াটেরা পালিয়ে গেলে ভাড়া আনতে যাওয়া রায়হানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যারা ভাড়া ছিল তারা মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। তবে রায়হানকে কোনো সময় মাদক সেবন করতে দেখেননি কিংবা শোনেননি বলে জানান তিনি। যা পোস্ট মর্টেমের প্রতিবেদনেও আসেনি।’

উল্লেখ্য, দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে ৬৯জনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে। সেই সাথে আলোচিত এই মামলায় ১৬৪ ধারায় ১০জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দী প্রদান করেন। ২২ পৃষ্টার অভিযোগপত্রে ৬জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, টুআইসি এসআই হাসান আলী, এএসআই আশেকে এলাহী, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস কারাগারে থাকলেও ঘটনার পর থেকে লাপাত্তা রয়েছেন কোম্পানীগঞ্জের আব্দুল্লাহ আল নোমান নামের এক যুবক। পিবিআই তাকে পলাতক দেখিয়ে অভিযোগপত্রটি কোর্ট পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।

এদিকে, চার্জশিট দাখিলের দিন পিবিআই সিলেটের সদরদপ্তরে রায়হান হত্যার সার্বিক বিষয় নিয়ে প্রেস ব্রিফ্রিং করেন বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবীর। তিনি বলেন, পিবিআই রায়হান হত্যা মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর মহানগর পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষ্য নেয়া, সাক্ষিদের জবানবন্দিসহ নানা বিষয় পর্যালোচনা করে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে। অভিযোগপত্রসহ মোট কেস ডকেট ১ হাজার ৯৬২ পৃষ্টা রয়েছে। এরমধ্যে ২২ পৃষ্টা হচ্ছে শুধু অভিযোগপত্র। পিবিআই তদন্ত করার সময় রায়হানের সাথে কোনো পুলিশ সদস্যদের শত্রুতা ছিলো কিনা সে বিষয়টি তদন্ত করা হয়। তবে এর সত্যতা মিলেনি। এছাড়াও পিবিআই আকবরের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ডিভাইসগুলো অ্যানালাইসিস করে প্রাপ্ত তথ্য অভিযোগপত্রে দাখিল করা হয়।

তিনি বলেন, ১০ অক্টোবর গোলাপগঞ্জের প্রতারক সাইদুল শেখ ও রনি শেখ দিবাগত রাত ১টা ৪৫ মিনিটে কাস্টঘর সুইপার কলোনি থেকে ৪ পিস ইয়াবা ক্রয় করে। ক্রয়কৃত ইয়াবাগুলো আসল নয় তারা বুঝতে পারেন। এরপর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাইদুল শেখকে মারপিট করে তার কাছ থেকে মোবাইল ও ৯ হাজার ৭০০ টাকা নিয়ে যান রায়হান আহমদ। পরবর্তীতে কোতোয়ালি থানাধীন মাশরাফিয়া রেস্টুরেন্টের সামনে গিয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সিয়েরা-৪ ও রোমিও-৪ এর কাছে সাইদুল শেখ ও রনি শেখ মৌখিকভাবে অভিযোগ করেন।

পরে পুলিশ কাস্টঘরের চুলাই লালের ঘর থেকে রায়হান আহমদকে আটক করে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। এরপর পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাই, পুলিশের সাথে খারাপ আচরণ করায় রায়হানকে ফাঁড়িতে নিয়ে এসআই আকবর বেতের লাঠি দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে মারপিট করেন। এরপর ১১ অক্টোবর সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে ওসমানী মেডিক্যালে রায়হানকে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য আসামিরা ভিকটিম রায়হানকে কাস্টঘরে ছিনতাকালে গণপিটুনিতে মারা গেছে বলে মিথ্যা তথ্য প্রচার করে এবং ঘটনার সংশ্লিষ্ট আলামত ধ্বংস করে।

তিনি আরও বলেন, পিবিআই দাখিল করা অভিযোগপত্রে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনের দুটি ধরা রয়েছে।

এর আগে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রীর করা মামলার পর মহানগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি তদন্ত করে ফাঁড়িতে নিয়ে রায়হানকে নির্যাতনের সত্যতা পায়। এরপর ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁঞাসহ চারজনকে ১২ অক্টোবর সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। ১৩ অক্টোবর পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে যান আকবর। ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত থেকে আকবরকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে বরখাস্ত কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও হারুন অর রশিদ এবং প্রত্যাহার হওয়া এএসআই আশেক এলাহীকে গ্রেফতার করা হয়। ১১ অক্টোবর রায়হানের মৃত্যুর দিনই ওসমানী মেডিকেল কলেজের মর্গে প্রথম ময়নাতদন্ত হয়। ময়নাতদন্ত শেষে রায়হানের শরীরে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। ভিসেরা রিপোর্টেও নির্যাতনের বিষয়টি উঠে আসে।

সিলেট প্রতিক্ষণ