149
Sharesসিলেটে চরম ঝুঁকির মাঝেও ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন লোকজন। টিলার পাদদেশে গড়ে ওঠা এসব বসত বাড়ির উপর যেকোনো মুহুর্তে ধসে পড়তে পারে টিলার অংশ বিশেষ। ঘটতে পারো দুর্ঘটনা। সিলেট হচ্ছে বৃষ্টি বহুল অঞ্চল। বর্ষা মৌসুম ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ভারি বর্ষণ হয়ে থাকে।
যে কারণে টিলার মাটি নরম হয়ে এক সময় বসতবাড়ির চালের উপর পড়ে যায়। এতে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। যদিও তারা জানেন তাদের এই সুখের ঘুম এক সময় চিরনিদ্রায় পরিণত হতে পারে। তারপরও মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকু ধরে রাখতে চরম ঝুঁকির মাঝে বসবাস করছেন।
ভয় উপেক্ষা করে নিদ্রা যাচ্ছেন। কিন্তু এসব মানুষদের নিরাপদ স্থানে পূণর্বাসনের উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও বিগত দিনে টিলা ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (৬ জুন) ভোরে জৈন্তাপুরে টিলা ধসে নারী-শিশুসহ একই পরিবারের ৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এরপর টনক নড়ে প্রশাসনের। টিলার পদদেশে বসবাসকারীদের সরে যেতে মাইকিং করা হয়।
অথচ এরআগে ভারি বর্ষণে ১৪ মে ভোররাতে গোলাপগঞ্জে টিলার মাটি ধসে ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রাণ হারান প্রাক্তন শিক্ষক এনজিও কর্মী অপু লাল রায় (৩০)। এছাড়া সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া ইউনিয়নে টিলা ধসে ৬টি বসতঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ঘিলাছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লেইস চৌধুরী জানান, টানা বৃষ্টিপাত হওয়ায় টিলার মাটি নরম হয়ে বাড়ির উপরে ধসে পড়ে। তার ইউনিয়নের উত্তর আশিঘর, ঈছাপুরে ৬ বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, জৈন্তাপুরে এখনো অসংখ্য পরিবার টিলার পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বাড়িগুলোতে বসবাস করছেন।
এছাড়া নগরী সংলগ্ন সদর উপজেলার বালুচরেও অসংখ্য পরিবার টিলার অর্ধেকাংশ কেটে বাড়ি বানিয়ে বসবাস করছেন। যদিও সিলেটের জেলা প্রশাসন মো. মজিবর রহমান বলেছেন, ভারি বর্ষণে টিলা ধসের আশঙ্কা থাকে।
তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে টিলার পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে। এরইমধ্যে উপজেলাগুলোতে মাইকিং করে জনসাধারণকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি জৈন্তাপুরে টিলা ধসে ৪ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর আরো ১৫ পরিবারকে সরে যেতে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল বশিরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, অনেকে ঝুঁকিতে থাকলেও চুরি হওয়ার ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে সরতে চাচ্ছেন না। এরপরও মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় সতর্কবার্তা পৌছে দেওয়া ছাড়াও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত আমজেরী হক বলেন, খাদিমপাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে টিলার পাদদেশে বসবাসকারী ঝুঁকিতে থাকা ৭টি পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে মাইকিং করে এলাকার লোকজনকে সতর্ক করা হয়েছে।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সীমা শারমিন বলেন, ভারি বর্ষণে উপজেলার ঘিলাছড়া ইউনিয়নে টিলা ধসের ঘটনা ঘটলেও মানুষজনের কোনো ক্ষতি হয়নি। অবশ্য এলাকাগুলোতে মাইকিং করে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
যারা ঝুঁকিতে বসবাস করছেন তাদের সরিয়ে নিতে চেয়ারম্যানদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এদিকে,বর্ষার আগেই সিলেটে এবার বন্যা দেখা দেয়। আর সাম্প্রতিক বন্যার পর ফের প্রবল বর্ষণে বাড়ছে নদ নদীর পানি। অতি বর্ষণে দেখা দিয়েছে পাহাড়-টিলা ধস।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, সিলেটে প্রতিদিন ভারি বর্ষণ হচ্ছে। তবে আগামি ১১,১২,১৩,১৪ ও ১৫ জুন প্রবল বর্ষণ হবে। যে কারণে টিলা ধসের আশঙ্কা থেকেই যায়। ফলে টিলার পাদদেশে বসবাসকারী জনসাধারণকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড়টিলার পাদদেশে অন্তত ১০ সহস্রাধিক পরিবার বসবাস করছেন। অথচ তাদের সরিয়ে নিতে কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। আর ঝুঁকিতে থাকা বসবাসকারীরাও নানা কারণে সরতে চাননা।
বর্ষায় ভারি বর্ষণে পাহাড় টিলাধস দেখা দিলেই মাইকিং করিয়ে হাকডাক ও নির্দেশনার মধ্যে প্রশাসনের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে। সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট তথ্যমতে, সিলেট বিভাগে টিলার পাদদেশে হাজার হাজার লোক ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।
অনাকাঙ্খিত প্রাণহানির ঘটনা ঠেকাতে প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০২ সালে শাহী ঈদগাহ এলাকায় ৪ জন, ২০০৫ সালে গোলাপগঞ্জে টিলা ধসে একই পরিবারের ৩ জন, ২০০৯ সালে মৌলভীবাজারে জেরিন চা বাগানে পাহাড় ধসে ৩ জন, একই বছরের ১০ অক্টোবর গোলাপগঞ্জের কানিশাইলে মাটি চাপায় ১ শ্রমিক মারা যান। ২০১৪ সালে ক্রিকেট স্টেডিয়ামের দেয়াল ধসে একই পরিবারের ৩ শিশুর মৃত্যু হয়।
আর জৈন্তাপুরে পাহাড় ধসে মারা যান আরো ২ শিশু। সর্বশেষ সোমবার (৬ জুন) জৈন্তাযপুরে টিলা ধসেমারা যান নারী-শিশুসহ একই পরিবারের ৪ জন। ২০১১ সালে আদালতের একটি রিটে সিলেটে ১ হাজার ২৫টি টিলার তথ্য পাওয়া যায়।
তবে জেলা প্রশাসনে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেট নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় ২শ টিলার পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এসব টিলার অনেকটিই সম্পূর্ণ বা অধিকাংশ টিলা অর্ধেক ও আংশিক কেটে ফেলা হয়েছে। আর টিলা কাটা অব্যাহত থাকায় বর্ষায় ধসে পড়ার ঝুঁকি আরো বাড়ছে।