190
Sharesশ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. এ এনামুল হক প্রশ্ন রেখে বলেছেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। সরকার হতভম্ব, পারছে নিয়ন্ত্রণ করতে?’ তিনি আরো বলেন, ‘বিচারে ড. ইউনুসের অনিহা নেই, আহতের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নেই। কিন্তু চিকিৎসা হচ্ছে না। তারমানে সংস্কার কোথায় দরকার বুঝছেন? ’
প্রত্যেকটা জায়গায় সংস্কার দরকার মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এত সংস্কার এক সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং আমাদের ঐক্যমত্য হওয়া উচিত নুন্যতম কিছু বিষয়ে, যেখানে আমরা একসঙ্গে কাজ করব। জাতি হিসেবে দেশপ্রেমি হিসেবে।’
আজ বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সিলেট নগরের কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে সিলেট প্রেসক্লাব আয়োজিত ‘সংস্কার, জাতীয় ঐক্য ও ভাবনা’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি ইকরামুল কবিরের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলামের পরিচালনায় নাগরিক সংলাপে প্রধান বক্তা ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক কামাল আহমদ চৌধুরী।
নাগরিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. এ এনামুল হক বলেন, ‘আমি শিক্ষক হিসেবে মনে করি, প্রধানভাবে একটা বিষয় বলতে চাই- দেশপ্রেমের বিষয়ে ঐক্যমত আনা উচিত। কারণ আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে দেশিপ্রেমের বাইরে নিজের প্রেম অনেক বেশি। গোষ্ঠি প্রেম অনেক বেশি। আমরা যে যে দলে বিভক্ত, রাজনৈতিকই না অন্যান্য, ছাত্র হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে, আইনজীবী হিসেবে বলতে পারেন আমরা প্রত্যেকে যার যার জিনিস নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, দেশটাকে পেছনে ফেলে। আমার উপলব্ধি এটা।’
![]()
তিনি বলেন, ‘এই সরকার এসেছে বেশি দিন হয়নি। ছয় মাস। ১৫০ এর বেশি আন্দোলন হয়েছে। তারমানে বুঝতে পারছেন সবাই সবারটা, এবং সবাই ভাবছে এই হচ্ছে একমাত্র সুযোগ। এই যে চিন্তা, এ চিন্তা থেকে এতসব আন্দোলন। আন্দোলন কমছে না বরং বাড়ছে-আমার যা মনে হচ্ছে। এই অবস্থায় ঐক্যমত তৈরির জন্য এ ধরণের সংলাপ।’ তিনি আরো বলেন, ‘অন্তত মানুষের মধ্যে অনুধাবন করা কতগুলো বিষয়ে আমরা একমত হতে পারি কিনা। আমরা একমত হতে আসিনি এখানে- এটা সত্য। আমরা এসেছি আলোচনাগুলো করা যাতে করে বাড়িতে বসে চিন্তা করা এই কয়েকটা বিষয়ে মনে হয় আমাদের একমত হওয়া উচিত।’
শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘আমরা যখন শ্বেতপত্র কমিটিতে কাজ করলাম তখন অনেকগুলো অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি এমন কাউকে পাইনি যিনি বলেছেন দুর্নীতির জন্য আমি দায়ী। সবাই বলেছেন, উপরের কেউ দায়ী। কত উপরে বুঝতে পারছেন আপনারা। তখন আমি বললাম, আরেকটু বেশি উপরে উঠাইলে তো আল্লাহর কাছে চলে যাবে। অর্থাৎ কেউ স্বীকার করতে রাজি না, নূন্যতম সততা আমাদের মধ্যে নেই। আমি শিক্ষক হিসেবে এ নিয়ে দুঃখ পাই।’
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি সাধারণ ভাষায় ন্যায় এবং অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করাটা সামাজিকভাবে, ব্যক্তিগতভাবে আমরা ভুলে গেছি। আমরা সবকিছুকে ন্যায় মনে করছি, সবকিছুকে অন্যায় মনে করছি। নিজেকে সকল কিছুর উর্ধ্বে মনে করছি। এরকম স্বার্থপরতা সমাজকে আগাতে দেবে না।’
ড. এ এনামুল হক বলেন, ‘ভোট এইবার যাই হোক, ভালো হইলে তাতে কিন্তু দেশ আগাবে এমন কোনো কথা নেই। ভালো ভোটের পরেও দেশের অবস্থা খারাপ হয়েছে নানাভাবে। তার মানে আমাদের চিন্তা করতে হবে, আমি বলি সংস্কার করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তায়। স্বল্প মেয়াদি চিন্তা করে খুব একটা লাভ নাই। কারণ স্বল্প মেয়াদে অনেক কিছু ঠিক করা যাবে না।’
সবার উপরে মানুষ মন্তব্য করে তিনিবলেন, ‘সবকিছু আইন দিয়ে করা যাবে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আইনের উর্ধ্বে মানুষ। বিচার, তাকে মানুষ হিসেবে চিন্তা করা শিখতে হবে, শিক্ষক হিসেবে আমরা মানুষ হিসেবে চিন্তা করব, আমরা যদি সবকিছু দলীভাবে নেই, সবকিছু রাজনৈতিকভাবে নেই তাহলে মানুষটা কোথায়। সবার উপরে মানুষ।
কতগুলো নুন্যতম বিষয়ে যেন একমত হই সে চেষ্টা করা দরকার জানিয়ে তিনি নেপালের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘একমত হওয়া খুব কঠিন। যতগুলো বিষয়ে আমরা একমত হতে চাচ্ছি, ১১টা কমিশন, এটা আমার কাছে মনে হচ্ছে এতগুলো বিষয়ে আমরা একমত হতে পারব না। আর আমরা যদি সবাই একমত হয়ে যেতে পারি তাহলে আমরা মানুষ থাকব না। মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকবে, মানুষের মধ্যে সহনশীলতা থাকবে। মানুষ তখন মানুষ হবে যখন সে হিংস্রতা পরিহার করতে পারবে। সুতরাং এটা গুরুত্বপূর্ণ।’
শর্ষেতে ভূত মন্তব্য করে ড. এনামুল হক বলেন, ‘অধ্যাপক ড. ইউনুসের বিচারে কোনো অনিহা আছে? নাই। আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে অনিহা আছে? নাই। কিন্তু চিকিৎসা হচ্ছে না। তার মানে সংস্কারটা কোথায় করতে হবে বুঝতে পারছেন? ভিতরে, শর্ষের ভিতরে ভূত।’
দুর্নীতির নানা দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন আলোচনা করলাম শ্বেতপত্রে- আমরা দেখেছি বিভিন্ন রকমের দুর্নীতি সমাজে। কত রকমের দুর্নীতি অবাক হবেন। একসময় গল্পচ্ছলে বলতাম, ঘুষ বলতে আমরা টেবিলের নিচ দিয়ে দিতে হতো। গত ১৫ বছরে টেবিল সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তার মানে ঘুষ দিতে টেবিলের নিচ লাগে না। আইন বদল করা হয়েছে ঘুষ খাওয়ার জন্য। আপনার ইলেকট্রিক মিটার আছে? ভালো মিটার বদলে দেওয়া হয়েছে যাতে করে আরেকজন সাপ্লাই করতে পারে। আমি কিছুদিন আগে একটা কমিটিতে আলোচনা করছিলাম, পল্লী বিদ্যুতে প্রচুর মিটার এমনিতেই ঘুরে। তারা ডিজিটাল মিটার তৈরি করছে। এবং এটা সংযোগ না দেওয়া স্বত্ত্বেও মিটার দিতে থাকে। বহু গ্রাহক এ নিয়ে আপত্তি করেছেন। আমার সঙ্গেও কথা হয়েছে। সিলেটেই হয়েছে। আমরা দেখলাম। এখানকার প্রকৌশলীরাই আমাকে বললেন এটা। আমি ঢাকায় গিয়ে যখন প্রকৌশলীদের বললাম সে কথা, তারা বললেন স্যার ৩ শতাংশ তো নষ্ট হবেই। বুঝতে পারছেন? আমাদের গোড়ায় গলদ। আমরা মানুষ হচ্ছি না। আমরা সাধারণ ন্যায় অন্যায় বুঝতে পারছি না। আমি তাদের বললাম, আমি কম্পিউটার কিনলে কি থ্রি পার্সেন্ট নষ্ট থাকে? ডিজিটাল আর কোনো জিনিস আমরা কিনি না। মানে পরিস্কারভাবে আপনার ভালো জিনিস ফেলে দিয়ে বাদ জিনিস কেনা হচ্ছে-বলা হচ্ছে এটা দরকার। এর ফলে কত টাকা দুর্নীতি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শুনলে অবাক হবেন। শুধুমাত্র উন্নয়ন বাজেটে গত ২০১০ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১৭ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি? তাতে কত টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলতে পারেন? প্রায় সাত লাখ কোটি টাকা। আমাদের হিসেবে। তার মানে এই টাকা কোথাও না কোথাও তছরুপ হয়েছে। এগুলো কি সব রাজনীতিবিদরা নিয়েছেন? জি¦ না? সরকারের আমলাদের ভাগ সবচেয়ে বেশি। আমরা যখন বলছি সংস্কার করব, এটাও সংস্কার করা উচিত।’
নিজের দিকে যারা আছেন তাদের দায় এড়ানোর নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘পনার দায়িত্ব ছিল। আপনি সব উপর দিকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। বলছেন, উপরের দিকে সবাই দুর্নীতি করছে। আমি কিছু করি নাই। আমার হাত পা বাঁধা। এটা সমাজে এক্সেপ্ট করাটা অন্যায়। এটা আমার কাছে এক্সেপ্ট করাটা অন্যায়। আমি এক্সেপ্ট করব না। আপনার দায়িত্ব ছিল। আপনি পালন করেননি। এটা আমি আজ নয়, পনের বছর আগে আগে থেকে লিখেছি। এক-এগারোর সময়। ধরেন নিচের দিকে। কারণ যার হাত দিয়ে গেল তার দায়িত্ব থাকবে না, দায়িত্ব নেবেন না কিছু, এটা হতে পারে না। এখন আমরা যদি বলি শেষ পর্যন্ত সবকিছুর দায় প্রফেসর ইউনুসের। তাহলে তো হবে না। প্রত্যেককে দায়িত্ব নিতে হবে। সেটাই সংস্কার করা দরকার। ’
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর সময় লাগে ছাত্রদের বুঝাতে যে তুমি এ কাজটা (নকল) করছ এটা অন্যায়। তারমানে ন্যায়বোধটা তৈরি করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
সংস্কারের প্রথম শর্ত দেশাত্মবোধ, ন্যায়বোধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হওয়া উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের সংস্কারের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত দেশাত্মবোধ, ন্যায়বোধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যেটা ছাত্ররা দেখিয়েছে। শুধু ছাত্ররা একা না সবাই মিলে। যত লোক আন্দোলনে নিহত হয়েছে তাদের অধিকাংশ কিন্তু ছাত্র না। হিসাব অনুযায়ী অধিকাংশ সাধারণ লোক। আমাদের ছাত্ররাই চিকিৎসাব্যবস্থা পায়নি, সাধারণ লোক পেয়েছে মানে করেন? অসম্ভব। এই পরিবর্তনগুলো আনা আমাদের দরকার।’
তিনি বলেন, ‘এরকম ঘটনা ঘটলে যিনি দায়িত্বে থাকবেন, যিনি চিকিৎসক চিকিৎসা দিতে রাজি হননি, আহত ছাত্র নিয়ে হাসপাতালে গেছে তার দায় ছিল না? কোনো চিকিৎসকের কি শাস্তি হয়েছে? হয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। সরকার হতভম্ব। পারছে নিয়ন্ত্রণ করতে? পারছে না? তারমানে আমাদের প্রত্যেকটা জায়গায় সংস্কার দরকার। এত সংস্কার এক সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং আমাদের ঐক্যমত্য হওয়া উচিত নুন্যতম কিছু বিষয়ে, যে আমরা এই কয়টা বিষয়ে একমত এবং সেখানে আমরা একসঙ্গে কাজ করব। জাতি হিসেবে থাকব, দেশপ্রেমি হিসেবে কাজ করব।’
ওয়াইএফ/০২