185
Sharesনিশ্চিত ও উন্নত জীবনের ফাঁদে পা দিয়ে জন্মভূমি ছেড়ে এ অঞ্চলে এসেছিলেন ভারতের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলের কিছু মানুষ। মূলত তাদের দিয়েই সিলেট ও আসামের গভীর জঙ্গলে শুরু হয় চা বাগান। চায়ের পাতা ইংরেজদের ধনবান করলেও দারিদ্রপীড়িত মানুষগুলোর ভাগ্য বদলায়নি। তারা প্রতারিত হন। নিপীড়িত এসব মানুষ এক সময় মুক্তির জন্য ‘মুল্লুকে চলো’র ডাক দিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। গোর্খা সৈন্যদের হামলায় প্রাণহানি ঘটলেও লাভ হয়নি এরপর ১০৪ বছর কেটে গেলেও ভাগ্যপ্রতারিত চা শ্রমিকরা আজও অমানবিক এক জীবন বয়ে চলছেন।
‘মুল্লুকে চলো’র সেই ডাকে পথে নামা চা শ্রমিকদের নিজ আবাস ভূমিতে ফেরা ঠেকাতে গোর্খা সৈন্যরা হামলা চালায়। ১৯২১ সালের ২০ মে চাঁদপুরে নির্বিচারে গুলিতে স্টিমার ঘাট ও রেলস্টেশনে অপেক্ষায় থাকা অসংখ্য শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেন। এই হত্যাকাণ্ডের কারণে আন্দোলন সর্বভারতীয় শ্রমিক আন্দোলনে রূপ নে। চাঁদপুর ও লাকসাম জংশনে রেল শ্রমিকরা পরদিন ২১ মে অনির্দিষ্টকারের ধর্মঘট ডাক দেন। ২৪ মে থেকে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের শ্রমিক এবং ২৮ মে থেকে স্টিমার ধর্মঘট শুরু হয়। দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলনের মুখে চা বাগানের ব্রিটিশ মালিকরা সমঝোতায় আসেত বাধ্য হন। এসময় বাগান মালিক ও প্রশাসনের প্রতিশ্রুতিতে কিছু শ্রমিক বাগানে ফিরে আসেন। বাকিরা ফিরে যান তাদের ‘নিজ মুল্লুকে’।
বাগান মালিক ও প্রশাসনের প্রতিশ্রুতিতে যারা ফিরে এসেছিলেন বাগানে-তারা কেমন আছেন? ১০৪ বছর পর পরিবর্তন হয়েছি কি তাদের ভাগ্যের? এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে সিলেটের বিভিন্ন বাগানের সরেজমিন ঘুরে চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেল এ প্রহসন ও বেদনার চিত্র। চা শ্রমিকরা বলছেন যারা মুল্লুকে ফিরে যাননি বাগান মালিকদের প্রতিশ্রুতিতে। তারা প্রতারিত হয়েছিলেন। ফেরেনি তাদের ভাগ্য। বরং পরবর্তী দীর্ঘ পরম্পরায় তাদের উত্তরসূরিরাও এখানো বারবার বাগান মালিকদের প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পা দিচ্ছেন উপায়ন্তর না দেখে। এখানো তাদের থাকতে হয় অনাহারে-অর্ধাহারে। শিশুদেরও কোনো ভবিষ্যৎ দেখেন না তারা। দারিদ্রপীড়িত এসব মানুষ এখন এই অঞ্চলকেই তাদের মুল্লুক ভাবেন। চান স্থায়ী ঠিকানা।
নগরের বিমানবন্দর সড়ক সংলগ্ন মালনিছড়া চা বাগান। এটি উপমহাদেশের প্রথম ও বৃহৎ চা বাগান। এই বাগানে বসবাস চল্লিশোর্ধ্ব চা শ্রমিক অঞ্জলি মোদির। দুই ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে সংসার। স্বামী স্ত্রী দুজনেই বাগানে কাজ করেন। সেখানে ছোট্ট একটি মুদি দোকানও আছে তাদের। কিন্তু বাগানের মজুরি আর দোকানের আয় দিয়েও সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অঞ্জলি মোদি বললেন, ‘কাজ করে করেই আমাদের জীবন চলে গেল। সন্তানদের জীবন একটু উন্নত করতে অনেক কষ্ট করছি। তিনজনরেই পড়ালেখা করানোর চেষ্টা করছি। এক ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে আরেকজন ফাইভে উঠছে। মেয়ে এবার ইন্টার পাশ দিয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে তারে আর পড়াইতে পারতেছি না। ছেলেগুলারেও চাহিদামত খাতা-বই দিতে পারি না। এগুলোর ব্যবস্থা করব না খাবারের ব্যবস্থা করব বুঝতে পারি না।'
খাদিম চা বাগানের রত্মা বসাকের অবস্থা অঞ্জলির চেয়ে আরো খারাপ। স্বামী মারা গেছেন ১২ বছর আগে। তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি পড়েন অকুলপাতারে। এক মেয়েকে কোনোমতে বিয়ে দিয়েছেন। বাকি দুই মেয়েকে পড়ানোর ইচ্ছা ছিল। কিন্তু অনটনের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তারপরও দারিদ্রতার সঙ্গে লড়ে ছোট মেয়েকে পড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অষ্টম শ্রেণিতে উঠার পর রত্নার শারীরিক অসুস্থতায় তা আর সম্ভব হয়নি। রোগসোগ নিয়ে বাগান কাজ করতে পারেন না আগের মতো। দ্বিতীয় মেয়েকে তাই চা বাগানের কাছের একটি ফ্যাক্টরিতে কাজে দিয়েছেন। দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়া মেয়েও সেখানে পায় না চলার মতো মজুরি। ছোট মেয়ে ফুটবল পাগল। বাগানের পাশের একটি ক্লাবে মেয়েদের সঙ্গে ফুটবল খেলেছে কিছুদিন। কিন্তু অর্থাভাবে সেটাও হচ্ছে না। অসুস্থ রত্না বসাক বলেন, ‘আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। নিজের শরীরও আজকাল চলে না। হুট করে যদি মরে যাই, মেয়েগুলোর কি হবে সেই চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।’
চা শ্রমিকদের আন্দোলন সংগ্রামের নেতা ও মালনিছড়া চা বাগানের রাগিব রাবেয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হৃতেষ মোদি। তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন মঙ্গাপীড়িত এলাকার মানুষ। তাদের উন্নত জীবনের আশ্বাস দিয়ে এখানে এনে গহীন বনের ভেতর এসব বাগান গড়া হয়েছে। এসব বাগান গড়তে বাঘ, সিংহের মতো হিংস্র জন্তু জানোয়ারের সঙ্গে তাদের লড়তে হয়েছে। জীবন দিতে হয়েছে। তাতে বাগান হয়েছে। ইংরেজদের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে আমার পূর্বপুরুষরা নিজ মুল্লুক ছেড়ে এসেছিলেন সেটি পূরণ হয়নি। তারা প্রতারিত হয়েছেন।’ মুল্লুক চলো আন্দোলনের ১০৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও চা শ্রমিকদের জীবনের কোনো পরিবর্তন আসেনি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার বয়স্ক ভাতাসহ কিছু সুবিধা দিচ্ছে, এনজিওগুলোও জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন কাজ করলেও আমাদের আসলে তেমন পরিবর্তন হয়নি।’ তারা এখন নাগরিক হিসেবে মর্যাদাটুকু চান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন আসেন তখন এক জেলা থেকে আরেক জেলায় এসেছিলেন। এখন তো তাদের মুল্লুক আরেক দেশ হয়ে গেছে। এখন আর ফেরার পথ নেই। এখন এটাই আমাদের মুল্লুক। তাই আমরা ঠিকানাহীন আর থাকতে চাই না। ঠিকানা চাই, নাগরিক হিসেবে মর্যাদা ও অধিকারটুকু চাই।’
ওয়াইএফ/০১